সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি গ্রামের ৩৫ বছর বয়সী আঙ্গুরা। সাত সন্তানের জননী হয়েও জানেন না গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব পরবর্তী সেবার গুরুত্ব সম্পর্কে। শুধু তাই নয় শেষ বার মা হওয়ার সময়ও নিজের গর্ভকালীন পরীক্ষা করানোর কোন প্রয়োজনবোধ করেন নি। ছয়টি সন্তানের জন্ম হয়েছে পারিবারিক সূত্রে পরিচিত ও এলাকার দাইয়ের হাতে। তারাও কখনো এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেননি। যারা মূলত তাদের অভিজ্ঞতার আলোকেই ধাত্রীবিদ্যার প্রয়োগ ঘটান। ঝুঁকিপূর্ণ মা ও শিশু সম্পর্কে তাদের কোন ধারণাই নেই। প্রসবকালীন জটিল ও বিপদজ্জনক অবস্থাকে যারা বিধাতার হাতে সঁপে দিয়ে বলতে থাকেন ‘বাঁচা মরা সবই তার হাতে, নেওরা মাল থাহে না’। তার সপ্তম বার গর্ভবতী হওয়ার পর তার এলাকার পি-সিএসবিএ’দের কার্যক্রম শুরু হয়।

অবশেষে নির্ধারিত দিন ঘনিয়ে আসতে থাকে। আঙ্গুরা সপ্তম বারের মত মা হতে যাচ্ছেন। কিন্তু পারিবারিক ও অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার কারণে কোন বিশেষ প্রস্তুতি বা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি আঙ্গুরার পরিবার। কারণ গত ছয়টি শিশুর জন্মের সময় বিশেষ কোন প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় নি। তাদের বিশ্বাস, প্রাকৃতিক নিয়মেই একজন নারী গর্ভধারণ করে এবং একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর প্রসবের সময় উপনীত হয়। এর জন্য বিশেষ কোন প্রস্তুতি বা ব্যবস্থা গ্রহণ হিসাবে একজন দাই মহিলাকে রাখলেই সকল সমস্যা সমাধান হয়। কিন্তু সপ্তম বারের মাথায় আঙ্গুরার জীবনে নেমে আসে অনাকাঙ্খিত প্রতিবন্ধকতা। তার গর্ভের সপ্তম সন্তানটি ভূমিষ্ট হবার পর শরীরের রং ছিল নীল বর্ণের,বাচ্চাটির শরীর ও নাক অপরিচ্ছন্ন ছিল এবং বাচ্চাটির শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক ছিল না। আঙ্গুরার প্রসবে সহায়তার জন্য নেয়া হয়েছিল পি-সিএসবিএ সালমা কে।

পি-সিএসবিএ সালমা তখন তার সাথে থাকা কৃত্রিম ভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখার যন্ত্র (কৃত্রিম শ্বাসের ব্যাগ, মাস্ক, সাকার) দিয়ে শিশুটির নাক, মুখ পরিস্কার করে শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় আনেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ করেন। এই অনাকাঙ্খিত প্রতিবন্ধক অবস্থা শুধু আঙ্গুরার একার নয়। সুনামগঞ্জের অধিকাংশ উপজেলায় আঙ্গুরার মতো শত শত মা অনাকাঙ্খিত এই ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে মাথায় নিয়েই প্রতিনিয়ত মা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সরকারি- বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত গবেষণা ও জরিপের (মেটারনাল মরর্টালিটি সার্ভে-এমএমএস, বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ্ সার্ভে-বিডিএইচএস) ফলাফলে স্বাস্থ্য সচেতনতার চিত্রও হতাশাব্যঞ্জক।

সাধারণত আঙ্গুরার মতো প্রত্যেকটি নারীই নারী জীবনের পূর্ণতার তৃপ্তি খুঁজে পান মা হবার মধ্য দিয়ে। বিধাতার সৃষ্টির মাঝে এখনও মা-সন্তানের মধুরতা আর আবেগের অনুভূতির প্রকাশ রয়েছে অব্যক্ত। কিন্তু ভৌগোলিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, ধনী-গরীব ভেদে মা হবার পিছনে রয়েছে এক কষ্টকর ও যন্ত্রনাদায়ক অধ্যায়। যা একজন মা ছাড়া কেউ পরিপূর্ণ ভাবে প্রকাশ করতে সমর্থ হন না। প্রতিকূল পরিবেশ, সামাজিক কুসংস্কার,অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার অনগ্রসরতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার ঝুঁকিপূর্ণ ও ভঙ্গুর পরিবেশ এই দেশের হাওর অঞ্চলের সন্তান সম্ভবা মায়েদের জীবনের প্রধান বাঁধা। কিন্তু প্রকৃতির এই বৈপরীত্যকে মেনে নিয়েই এই পশ্চাৎপদ অঞ্চলে নারীদের জীবনের অন্তহীন অববাহিকা।
বাংলাদেশ সরকারের মাতৃৃস্বাস্থ্যসেবা ও মাতৃমৃত্যু সংক্রান্ত এক জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ২০ শতাংশ মৃত্যুই ঘটে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিজ বাড়িতে মারা যান। কারণ সেখানে দক্ষপ্রসব সহায়তাকারী থাকেন না। ফলে জটিলতা নিরূপণ করে নারীদের হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হয় না।

২০১২ সালের আগষ্ট মাসে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্যের তথ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিক্ষার স্তর, পেশা, পরিবারের আয়, অবস্থান, লিঙ্গ, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এসব আর্থসামাজিক বিষয় বৈষম্য তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ধনী ও গরিব ভেদে এই চিত্র আরোও দুঃখজনক। হাওরাঞ্চলের মানুষগুলো যেন দরিদ্রশ্রেণীর মানুষেরই প্রকৃষ্ট উদাহারণ। প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যের ছয়টি ক্ষেত্রের বৈষম্যের তথ্যরয়েছে। যেমন, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী ব্যবহার, প্রসব-পূর্ব স্বাস্থ্যসেবা, প্রসবের সময় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি, এক বছর বয়সী শিশুদের ডিটিপি-৩ টিকা প্রাপ্তি, পাঁচ বছরের কম বয়সী খর্বাকৃতির শিশুদের হার এবং পাঁচ বছরের শিশুদের মৃত্যুহার। প্রতিবেদন সূত্র অনুযায়ী, দরিদ্র শ্রেণীর শিশুদের ৯২ শতাংশ ডিপিটি-৩ টিকা পায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহার (প্রতি হাজারে) দরিদ্র শ্রেণীতে ৮৫। নিরাপদ প্রসব এবং প্রসূতি ও নবজাতকের সুস্থ্যতার জন্য গর্ভবতী অবস্থায় চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাংলাদেশে দরিদ্র শ্রেণীর মাত্র ৭ শতাংশ গর্ভবতী চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। মাত্র ৫ শতাংশ দরিদ্রপ্রসূতি প্রসবকালে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা পান।

জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী ব্যবহারের হার দরিদ্র পরিবারে ৪৭ শতাংশ। মা নিরক্ষর হলেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর। নিরক্ষর মায়েদের মধ্যেচারবার প্রসব-পূর্ব স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর হার মাত্র ৬ শতাংশ। মায়েদের মাত্র ৪ শতাংশ প্রসবকালে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা পান। নিরক্ষর মায়েদের শিশু ডিটিপি-৩ টিকা পায় ৮৫ শতাংশ। ৫১ শতাংশ নিরক্ষর মায়ের শিশু বয়সের তুলনায় ওজন কম হয়। নিরক্ষর মায়েদের শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহার (প্রতি হাজারে) ৯১ শতাংশ।
বাংলাদেশের মা ও শিশু স্বাস্থ্যের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সুনামগঞ্জ অঞ্চলের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। এই অবস্থা বিবেচনায় ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশ এবং গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন যৌথভাবে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সুনামগঞ্জের ১০টি উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নের (প্রতি উপজেলায় ৫টি করে ইউনিয়নে) যাত্রা শুরু করে কেয়ার-জিএসকে সিএইচডব্লিউ ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প। উদ্দেশ্য মাঠ পর্যায়ে জনঅংশগ্রহণের মাধ্যমে উচ্চমান সম্পন্ন, টেকসই ও জীবন রক্ষাকারী মা-নবজাতক ও শিশু সেবা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সেবা গ্রহণ মানসিকতার উন্নয়ন। হাওরের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নাগরিক সুযোগ সুবিধার অপ্রতুলতার কারণে দক্ষ স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারীর অভাব মা ও শিশু স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ। তৃণমূল পর্যায়ে দক্ষ স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী তৈরির লক্ষ্যে এ প্রকল্পের আওতায় প্রকল্প এলাকায় ১৭৬ জন যোগ্যতা সম্পন্ন নারীকে নির্বাচন করে সরকারি স্বীকৃত কারিকুলামের আওতায় ০৬ মাস মেয়াদী সি-এসবিএ, ৭ দিনের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা, ৫ দিনের সি-আইএমসিআই, ২ দিনের এমআইএস এবং ৩ দিনের সোশ্যাল বিজনেস প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাইভেট কমিউনিটি বেজড্ স্কিলড্ বার্থ এটেনডেন্ট (পি-সিএসবিএ) হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। যারা তাদেও নিজ এলাকায় স্বল্পমূল্যে মা ও শিশু স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক সেবা প্রদান করছে। প্রকল্প এলাকার এই পি-সিএসবিএদের কার্যক্রমকে আরও স্থায়িত্বশীল করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, ইউনিয়ন পরিষদ, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী (সিএইচডব্লিউ), কমিউনিটি সার্পোট সিস্টেম (সিএমএসএস) এর সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এই হাওরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা প্রদান অব্যাহত রাখা ও পি-সিএসবিএদের স্বাবলম্বী করার জন্য এই প্রকল্পে সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ শুরু করে কেয়ারের একটি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জিতা সোশ্যাল বিজনেস বাংলাদেশ লিঃ। জিতা এই প্রকল্পের পি-সিএসবিএদের মাঝে স্বাস্থ্য সেবা ও সামগ্রী বিপণনের কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সামাজিক ব্যবসা বা আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। যার ফলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এই অবহেলিত জনপদেরই স্থায়ী বাসিন্দা, যারা স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের আত্মনির্ভরশীল ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।নিজ ও পরিবারের স্বচ্ছলতা আনা তাদের কাছে একদিন দুঃস্বপ্ন হলেও বর্তমানে এদের অনেকেই স্বপ্ন দেখছেন। নিজ এলাকার অবহেলিত, দুঃস্থ ও দরিদ্র মা, শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মাধ্যমে বিশেষ করে বাড়িতে নিরাপদ প্রসব করার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতার বিকাশ ঘটাচ্ছেন। পাশাপাশি সেবামূল্য দিয়ে নিজের ও পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে অনেকেই স্বচ্ছলতার উদাহারণও তৈরি করেছেন।

এই পি-সিএসবিএদেরকে গ্রামের গর্ভবতী মহিলা ছাড়াও অনেকেই ডাক্তার আপা নামেই বেশি চেনেন। তাদের প্রতি সেবা গ্রহীতাদেরও রয়েছেঅনেক আস্থা-বিশ্বাস। তাদের আন্তরিক সেবা প্রদানের ফলে দিনে দিনে সেবাগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রকল্পের সূত্র অনুযায়ী ২০১২ সালের ডিসেম্বর হতে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প এলাকায় পি-সিএসবিএদের মাধ্যমে বাড়িতে প্রসবের সংখ্যা ৪,৫৫১টি। শুধু তাই নয় গর্ভকালীন, প্রসবকালীন, প্রসবপরবর্তী অনেক কু-সংস্কারেরও পরিবর্তন ঘটছে। বাড়িতে নিরাপদ প্রসবেরফলে একদিকে যেমন হাওর অঞ্চলের দরিদ্র প্রসূতি মা ও শিশুর জীবন বিপন্নতার হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে, অন্যদিকে পি-সিএসবিএরা আয়বর্ধক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে, সমাজে তৈরি হচ্ছে আত্মপ্রত্যয়ী-স্বাবলম্বী নারী। যারা নারী হয়ে অন্য একটা নারীর জীবনের সংঙ্কটময় মূহুর্তের বন্ধু হয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে আন্তরিক সেবা ও মানবিকদায়িত্ববোধ।

লেখক : সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্যকর্মী ও ফিল্যান্স সাংবাদিক । 
sumitbanik.bd@gmail.com 

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
About Author

সুমিত বণিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *