প্রাণিকূলের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন অক্সিজেনের আধার বৃক্ষকুল। সঙ্গত কারণে উন্নয়ন সংগঠন হিসেবে এইড ফাউন্ডেশন; যেথায় সুযোগ মেলে সেথায় বৃক্ষরোপণের ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠাকালীন হতেই বহন করে, নিবিড় পরিচর্যায় কিছু বৃক্ষ রূপান্তরিত হয়েছে মহীরুহ। অধিকাংশ হারিয়ে গেছে অবহেলার আর অনাদরে। যেভাবে সর্বত্র বৃক্ষরাজি বিলীন হচ্ছে তাতে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে, পৃথিবীর মানুষকে নভোচারীর পোশাকে, পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ধরণীতে বিচরণ করতে হবে! করোনাকাল তার বাস্তব শিক্ষা!

ঢাকাস্থ শ্যামলী পার্কের বটবৃক্ষটিকে রক্ষা করা যায়নি কিন্তু তার একটি চারা স্বযত্নে রক্ষিত আছে,পার্কের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে, সেথায় বৃক্ষের চারাটি রোপিত হবে। গাছের চারা রোপণ করা খুবই সহজ একটি কাজ, কিন্তু তাকে বৃক্ষতে রূপান্তরিত করতে, সুসন্তান গড়ার মতোই পরিচর্যা ও সাধনা করতে হয়!

উভয়কূলের জিনে বৃক্ষ-প্রাণি প্রেম প্রকট, যা এইড বিকশিত হতে সহায়তা করেছে। তাই তো বৃক্ষ রক্ষায় অনেক আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে সাময়িক বৃক্ষ নিধন বন্ধ করা সম্ভব হলেও, প্রতিনিয়ত বৃক্ষ ভক্ষণকারীদের হাতে বিলীন হচ্ছে বৃক্ষ! এইভাবে দেশের সর্বত্র নির্বিচারে নানা কারণসহ সনাতনী ইটভাটা ও তামাক প্রক্রিয়াজাত করণে গণহারে বৃক্ষ নিধন চলছে। দেশের খেজুর ও তালগাছ বিলীন, তাই দেশে বর্ষা মৌসুমে বজ্রবিদ্যুৎ এ মৃত্যুর হার পৃথিবীতে সবথেকে বেশি! তাইতো বৃক্ষপ্রেমীদের উদ্বুদ্ধ করতে ‘গাছ পাগল’ নামে ফেসবুক পেজ, গান ও পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকার নাম বিষয়ে সংস্থার শ্রদ্ধেয় উপদেষ্টা মহাকবির কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি বলেছিলেন ‘গাছ পাগল’ মানে ‘উদোম পাগল’ এই নামে কি কোনো পত্রিকা হয়!’ বলেছিলাম, ‘উন্মাদ’ নামে যদি জনপ্রিয় পত্রিকা হতে পারে; গাছ পাগলে সমস্যা কোথায়? তারপর তিনি দিয়ে ছিলেন আড়ি! আড়ি ভাঙাতে শতচেষ্টা সফল, মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে ছিলেন। এমন কত শত ঘটনা বৃক্ষ নিয়ে আছে তার কোনো ইয়ত্তা নাই।

একজন ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু এখন প্রবাসী, দেশে এসে বলেছিল ‘আমার বাড়ির প্রাচীরের পাশে কিছু সুগন্ধি ফুল লাগিয়ে দিস, আগামীবার এসে ফুলের সুবাসে বন্ধুদের পানাহারের ব্যবস্থা হবে।’ কথা রাখেনি বন্ধু। শিউলি, কামিনী, বকুল গাছগুলো মরে গেছে অবহেলায়- অযত্নে, বিশাল হাসনাহেনা গাছটি বিপন্ন! অনাদরে-অবহেলায় বন্ধুর বাণী ‘মানুষ বাঁচে আশায়, দেশ বাঁচে ভালোবাসায়’ বিবর্ণ! চলার পথে অনেক গাছ ও প্রাণি পাগলদের সন্ধান মিলেছে কিন্তু অধিকাংশ মাউথ ক্যাডারের মতোই ভার্চুয়ালি প্রাকৃতিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে চায়! তাই ফলাফল অশ্ব ডিম্ব!

ঝিনাইদহের নতুন ধোপাঘাটা সেতুর পুরাতন রাস্তা জেলা পরিষদের কাছ থেকে বনায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত নেওয়া হয়। রোপিত চারার অধিকাংশই বিলীন, কিছু বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়। ধোপাঘাটা নতুন সেতু নির্মাণের সময় প্রথমেই বৃক্ষ গুলোকে নিধন করা হয়। এমনকি সীমানার বাইরের বৃক্ষও রক্ষা পায়নি। যেমনিভাবে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পুনঃ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ ও একই সাথে বৃক্ষ নিধন। দেশের সকল আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীদের সে বিষয়ে কোনো টুঁ-শব্দ নাই কিন্তু একই সাথে কাঠখোট্টা বিষয় নিয়ে পড়ুয়া বুয়েটের শিক্ষার্থীদের নানা দাবির মধ্যে প্রাচীন বৃক্ষ রক্ষার দাবী শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে বিজয় হয়। যা নতুন আশার সঞ্চার করে।

ধোপাঘাটা সেতু নির্মাণের সময় সনাতনী পদ্ধতিতে বাঁধ দিয়ে সেতুর কাজ হয়। বর্ষা মৌসুমে সেই মাটি সর্বত্র ছড়িয়ে নবগঙ্গা নদীতে চর পড়েছে। এইড কমপ্লেক্সের স্বাদের আমড়া গাছে পরগাছায় ভরে গেছে, তবে চমৎকার ফুল! এক সময় এই পরগাছার আঠা দিয়ে, খেজুর গাছের রসের কাঠির সাথে চুইংগামের মতো আঠা দিয়ে শালিক পাখি ধরা। শালিক পাখিকে ময়নার মতোই পোষ মানানো কিন্তু মানুষ শোনে না কথা! হায় আফসোস! মাউথ ক্যাডাররা এখন ভার্চুয়াল আন্দোলনের রূপকার। তাই বালিশ পাসিং খেলার মতোই কাজ শুধু পাসিং করে যায়! উপায়?

এইড কমপ্লেক্সের গাঙের ঘাটের পাশ দিয়ে, নানা প্রজাতির মাতৃ বৃক্ষরাজির পরিপক্ক ফল হতে বীজ করা হয়। তাও রক্ষা করা যাচ্ছে না। এক পাশে বেতের বাগান তার মাঝে ডাহুক পাখির অভয়াশ্রম, সেগুলোও সৌখিন মৎস্য শিকারী ও ষাটবাড়িয়া গ্রামের দুষ্টু বালকদের অত্যাচারে বিপন্ন। ধ্বংস হতে বসেছে দীর্ঘদিনের পরিচালিত জলজ প্রাণিদের অভয়াশ্রম! নতুন উদ্যমে চলতি মৌসুমে ধোপাঘাটা ব্রিজের রাস্তার পাশে বিভিন্ন বৃক্ষ রোপণ করা হয়। নতুন মাটিতে বৃক্ষগুলি তরতাজা হয়ে উঠেছিলো কিন্তু এখন বৃক্ষগুলো অধিকাংশ নেই, সেথায় দোকানের সারি। সবথেকে কষ্টের বিষয় মুস্তাফিজুর মিন্টু ভাই ও মৌসুমি মকবুল বেলী ভাবির বাড়িতে একটি বটবৃক্ষ ছিল, যা তাঁদের কন্যা সমতুল্য সেটাকে ওখানে রোপণ করা হয়। তাঁরা প্রায় বৃক্ষটিকে দেখতে আসতেন। এবার এসে খুঁজে পেলাম না, ইচ্ছা হলো না খুঁটিয়ে দেখা, মৃত মানুষের মুখ দর্শন যেমন ইচ্ছা হয় না! ওইখানে আরেকটি বটবৃক্ষ মহীরুহ হয়ে, বৃক্ষপ্রেমীদের সান্তনা দেবে। এই প্রত্যাশায়-

লেখক: তারিকুল ইসলাম পলাশ, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, এইড ফাউন্ডেশন। 

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
About Author

সুমিত বণিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *