গুণগত গবেষণা শেখার জন্য প্রয়োজন অনেক জ্ঞান চর্চা, অধ্যবসায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ এবং সর্বোপরি ভালো মেন্টরিং। আমরা এখানে আলোচনা করব, একদম নবাগত তরুণ একজন গবেষক কিভাবে গবেষণার প্রাথমিক ধাপ গুলোকে মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করবেন, তা এখানে আলোচনা করবো।

ধাপগুলো হল-   

ক. কি গবেষণা করবেন? (What to Research?)

খ. কিভাবে গবেষণাটি করবেন? (How to Research?)

গ. গবেষণাটি পরিচালনা ও রিপোর্ট প্রস্তুত করা (Research Execution & Reporting)

ক. কি গবেষণা করবেন?

ধরুন, আপনি একজন তরুণ গবেষক মানে, আমার মতো, খেয়েদেয়ে কাজ না পেয়ে বনের মোষ  তাড়াবেন বলে মনস্থির করেছেন। এখন মূল সমস্যা হল, আপনি জানেনই না, মহিষ কোন বনে থাকে। সেটা কোন বড় কথা নয়, বড় কথা হল, আপনি জানেনই না বনটাই আসলে কোথায়! এই যখন অবস্থা, তখন আগে আপনার কাজ হল বন কোথায় খোঁজা, তারপর না হয় বনের মোষ খুঁজে নেওয়া যাবে। অর্থাৎ আপনি বুঝতে চাচ্ছেন আমি কি নিয়ে গবেষণা করব? হুম, গবেষণার ভাষায় এটাকে বলে- Finding out a research problem বা গবেষণার জন্য সমস্যা খোজা।  

বড়ই প্রবলেম!

স্থির হন, শান্ত থাকুন, প্রয়োজনে ধ্যানস্থ হোন।

আসলে আমরা গবেষণা কেন করব?

কারণ হতে পারে, আমার চোখে এমন একটা বিষয় পড়েছে যেটা আমার কাছে অসংঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে! সেটা হতে পারে রাস্তায় রিক্সাওয়ালাদের আচরণ, সিএনজি ওয়ালার বেশি ভাড়া দাবি থেকে শুরু করে হাসপাতালে মানুষ কেন অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে বা ডায়াবেটিস রোগী রোগ নিয়ন্ত্রনে থাকছে না! যেকোন কিছু!

এই সহজ ব্যাপারটাকে গবেষকেরা বলেন, Observation বা পর্যবেক্ষণ।

আবার, এমনও হতে পারে যে আপনি কর্মক্ষেত্রে দেখছেন, যেমনটি হওয়ার কথা তেমনি হচ্ছে না। মানে, আপনি যে কাজ করলে যে ফল পাওয়া উচিৎ তা পাচ্ছেন না!

আরে সর্বনাশ, এমন কেন হচ্ছে!

আপনি রোগীকে ওষুধ দিলেন, কিন্তু রোগী তবুও বলে, নাহ ডাক্তার সাহেব, আমি তো ভালো হচ্ছি না!

কিন্তু কেন? হতে পারে, আপনার ওষুধের ডোজ ঠিক হচ্ছে না, হতে পারে, সে ওষুধ খাচ্ছেই না, এমনও তো হতে পারে, সে ভেজাল ওষুধ খাচ্ছে। আবার এও হতে পারে, সাপোজিটরি দিয়ে বলেছেন, এটা পায়খানার রাস্তায় দেবেন, তিনি নিয়মিত কমোডে সেগুলো দিয়ে আসছে, তবুও রোগ তো সারছে না!

ভালোই ভ্যাজাল! গবেষকদের খেয়েদেয়ে কাজ কর্ম নাই, তাই তারা এর একটা গালভরা নামও দিয়েছেন Practical Challenges বা ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ।

এখন আরেক শ্রেণী আছে, এরা জ্ঞানী মানুষ। আমরা যখন ফেসবুক পড়েই শেষ করতে পারিনা তখন তারা রিসার্চ গেট, অরর্চিড এ একাউন্ট খোলে!

ভালো যন্ত্রণা। তো এই শ্রেণী করল কি, গুগল স্কলার, পাবমেড এসব যায়গায় যেয়ে দুনিয়ার কে কি রিসার্চ করল তাই পড়ে বেড়ায়! আর খুঁজে খুঁজে বের করে। কে কোথায় কি ধরণের সমস্যা পাকালো! তো রিসার্চের রেজাল্টের সাথে হয়তো সে দ্বিমত হল বা উপসংহারে খুঁজে পেল নতুন রিসার্চের পরামর্শ!

এটাকে বলে ক্লু ফ্রম প্রিভিয়াস রিসার্চ বা পূর্বের গবেষণা থেকে সমাধানের সূত্র খোঁজা।  

তাহলে মোদ্দাকথা হল-

  • পর্যবেক্ষণ করা (Observation)
  • বাস্তব চ্যালেঞ্জ (Practical Challenges)
  • পূর্বের রিসার্চ থেকে ক্লু খুঁজে বের করা (Clue from Previous Research)

এই হল রিসার্চ কোশ্চেন খুঁজে পাওয়ার মোদ্দা কথা। এগুলো একদম অ,আ, ক, খ পর্যায়ের কথা, শত সহস্র নামীদামি বই আছে, সেগুলো পড়লে জানা যাবে এই অজানা দরজার নানা কথা। এবার একটু ধাপে ধাপে দেখা যাক-

এবার এতক্ষণ ধরে যা যা পেলেন, তা নিয়ে একটু ভাবুন। আবার ভাবুন, আবার ভাবুন। প্রয়োজন হলে ধ্যানস্থ হন।

তবে এই দফায় শুধু ধ্যানে হবে না, আলোচনা করুন, সমালোচনা শুনুন। প্রয়োজনে সিনিয়রদের ঝাড়িও সহ্য করুন। বিশ্বাস করুন, এর প্রত্যকটা আপনাকে এগিয়ে নেবে, অনেক অনেক এগিয়ে নেবে।

যখন যা ঘটছে নোট নিয়ে নিন। কাটাকাটি খেলুন, নিজের সাথে নিজেই।

এটাকে নাকি বলে- ব্রেইন স্টরর্মিং, ঝড় তুলুন চিন্তার জগতে, উন্মুক্ত মনে।

এবার ঝড়ে সব এলোমেলো! এই এলোমেলো জঙ্গলে এবার আপনার মোষের খোঁজে নামতে হবে!

সবকিছু বিবেচনার নিয়ে, অর্থাৎ

  • অবজারভেশন বা পর্যবেক্ষণ করা
  • প্র্যাক্টিক্যাল চ্যালেঞ্জেস বা বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো
  • ক্লু ফ্রম প্রিভিয়াস রিসার্চ বা পূর্বের রিসার্চ থেকে সমাধানের সূত্র খুঁজে বের করা

এর থেকে আপনি একটা ধারণা করুন, বনের কোন দিকে মোষ থাকতে পারে!

অর্থাৎ, বিশাল জ্ঞান সমুদ্রের কোন দিকে আপনি নজর দিতে চান। যেমন, আপনার ইচ্ছা ডায়াবেটিস নিয়ে গবেষণার। তাহলে এতক্ষণ যে কাজ করেছেন, তার আলোকে সিদ্ধান্ত নিন। আপনি কোন দিকে কাজ করতে চান?

ডায়াবেটিসের ওষুধ নিয়ে?

নাকি, ডায়েবেটিস রোগীর খাদ্যাভাস নিয়ে?

নাকি, ডায়াবেটিস এর জীবনাচরণ নিয়ে?

নাকি, অর্থনৈতিক দিক নিয়ে?

নাকি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে ?

নাকি ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি……………………

এই ইত্যাদিকে খুঁজে বের করা আপনার কাজ। এই খুঁজে বের করার প্রক্রিয়ার একটা পোশাকী নাম আছে। নাম তার- ইনটিলেক্ট গেজ (Intellect Gaze).

এবার আসল কাজে আসি। জ্ঞানী মানুষেরা একে বলেন, লিটারেচার রিভিউজ্ঞানীরা বলেন রিসার্চের আসল কাজ নাকি হল এই লিটারেচার রিভিউ। নিউটনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এবার কাজ হল বিশাল জ্ঞান সমুদ্রে নুড়ি কুড়ানো! অর্থাৎ বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে যেয়ে আপনার বাছাই করা বিষয়ে কে কোথায় কি কি গবেষণা করেছে তা খুঁজে খুঁজে বের করা। তার রেজাল্ট, মেথডোলজি, স্যাম্পলিং মেথড এসব পড়ে ফেলুন।

এতে আপনার ধারণা ও গবেষণা প্রস্তাবের ধার বাড়বে। এবার মোটামুটি সব তথ্য উপাত্ত সাজিয়ে একটা খসড়া করে ফেলুন। এটাকে বলা যেতে পারে Research Proposal Summary  বা গবেষণা প্রস্তাবনার সারাংশ।

এতক্ষণ যা যা ভাবলেন, করলেন, পড়লেন সেগুলো মিলিয়ে একটা চিন্তা করে ফেলুন কিভাবে, কোথায়, কাদের মাঝে গবেষণা করবেন, কি করবেন, কি করবেন না। এই কাজটা করে ফেলুন। এর নাম দেওয়া যায়- ইনক্লুসান এবং এক্সকুসানএবার সবকিছুকে এক লাইনে নিয়ে আসুন। মোটামুটি রেডি আপনার রিসার্চ টাইটেল ও রিসার্চের প্রাথমিক কর্তব্য! এটাকে বলা যায়- রিসার্চ কোশ্চেন (Research Question)। (…. চলবে )

 

লেখক : অনুপম দাস, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যকর্মী ।

anudasrpmc39@gmail.com

 

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
About Author

Voicebd Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *