আমার সব লেখায় আমার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা আর পার্সোনাল টাচেস কিছু থাকেই। এই লেখাটাও এর ব্যতিক্রম নয়। আজকে চেষ্টা করেছি লিখেতে, কেমন হওয়া উচিত একটা সিভি! আমার মতো হয়তো জীবনের শুরুতে অনেকেই কনফিউসড হয়ে থাকেন যে, কিভাবে একটা ভালো মানের সিভি তৈরি করবেন! আমি আমার প্রথম সিভি লিখি ২০১৫ সালের অক্টোবরে, তখন সবেমাত্র আমার মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নশিপ শেষ হয়েছে। সবাই দেখলাম আমার মেডিকেল কলেজের সামনের ফটোকপির দোকান থেকে একই ফরম্যাটের সিভি বানিয়ে আনছে। আমিও বানাতে গেলাম, কিন্তু সিভির চেহারা সুরত আর কন্টেন্ট দেখে নিজেরই পছন্দ হল না। সেইসাথে সিভি দেখে আমি নিজেই কনভিন্সড না, রিক্রুটাররা কি কনভিন্সড হবে!

তো নিজের রুমে ফিরে, নিজেই গবেষণা করতে লাগলাম কিভাবে মনের মতো একটা সিভি বানানো যায়! গুগলে বাটি চালান দিলাম, দেখি ভালো কিছু পাওয়া যায় কিনা। অনেক গুলো ওয়েবসাইটও পেলাম, সুন্দর সুন্দর সিভি স্যাম্পল পেলাম। তারপরেও মন ভরলো না। (এই পর্যায়ে এসে পাঠক ভাবতে পারেন, আরে ভাই, সমস্যা কি আপনার? মন ভরে না কেন?)

কারণ, গুগল থেকে যেগুলো ইনফরমেশন বা সিভি স্যাম্পল পাচ্ছিলাম সেগুলো, সব এক্সপেরিয়েন্সড মানুষদের। আমি তো ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট, এই ফরম্যাটে নিজেকে ফেলাতে পারছিলাম না। তাহলে উপায়? এবার গুগলে খোঁজা শুরু করলাম, ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট হিসেবে কিভাবে একটা ভাল মানের সিভি লেখা যায়। সেই সাথে একটা সিভিতে কিকি থাকে! অনেক ঘাটাঘাটি আর খোঁজাখুঁজির পর বুঝতে পারলাম, আমাকে কি করতে হবে। 

প্রথমেই যেটা বুঝলাম একটা অসাধারণ প্রফেশনাল সামারি/ক্যারিয়ার অবজেকটিভ/বায়ো লিখতে হবে। তিন চার লাইনের ভেতরে। যেটা দেখেই রিক্রুটার বুঝে নেয় যে, এই ক্যান্ডিডেটের ভিতরে কিছু একটা আছে! তো আমি যেটা করলাম, একটা টুইস্টেড ক্যারিয়ার অবজেকটিভ লিখলাম যেটা পড়ে রিক্রুটারের আগ্রহ জন্মায়। 

যেটি অনেকটা এরকম ছিল, “With a robust interest in the field of public health, I would like to serve in a highly esteemed organization which will provide me a platform to use my expertise and skills for mutual growth and benefit of the organization and myself.” 

লক্ষ্য করে দেখেন, 

১) আমি কিছু ভারিক্কি প্রফেশনাল ওয়ার্ডস (robust, serve, highly esteemed, mutual growth and benefit) ইউজ করেছিলাম যেগুলো জেনেরিক ওয়ার্ডস নয়। 

২) যে অর্গানাইজেশনে এপ্লাই করছি তাকেও একটু হালকা করে প্রশংসাও করে ফেললাম ‘highly esteemed organization’ বলে। এতে রিক্রুটারকে হালকা করে এটাও জানানো হল যে,”দেখো, আমি তোমার অর্গানাইজেশন নিয়ে উচ্চ ধারণা পোষণ করি”। আর প্রশংসায় কে না খুশি হয়?

৩) সাথে আবার এটাও বলছি আমার কি কি স্কিলস ও এক্সপারটিজগুলো আছে, যার কারণে আমি এই পদে এপ্লাই করতে চাই! এই পর্যায়ে আমি চেষ্টা করেছি রিক্রুটার যেন আমার সিভির এটুকু পড়েই ফেলে না দেন, বাকিটাও পড়েন। কারণ, আমি ধারণা করে নিয়েছিলাম যে, এটুকু পড়ে রিক্রুটারের মনে কিছুটা হলেও আগ্রহ তৈরী হবে যে “পাবলিক হেলথ ফিল্ডে একজন ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট, তার আবার স্কিল আর এক্সপারটিজ কি?” এই আগ্রহটার বশে হলেও যেন তিনি আমার সিভির বাকি অংশটুকু পড়েন। 

৪) শেষ অংশে লিখেছি, আমি চাই অর্গানাইজেশনের এবং আমার মিউচুয়াল সাকসেস। এই অংশটুকু পড়ে যেন মনে হয়, এপ্লিক্যান্টের তো ট্রু ইন্টেনশন আছে সৎভাবে অর্গানাইজেশন ও কাজটি কে সার্ভ করার, একই ভাবে সে নিজেকে নিয়েও সচেতন।

শুধুমাত্র প্রফেশনাল সামারি/ক্যারিয়ার অবজেকটিভ/বায়ো নিয়েও কেন এত কথা বলছি। কারণ, পাবলিক হেলথ ফিল্ডে যেমন প্রতিযোগিতা রয়েছে, তেমনি নিজস্ব দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণের অবারিত সুযোগ রয়েছে। আর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে আপনার যোগ্যতা ও প্রতিভা সম্পর্কে জানান দেয়ার প্রাথমিক উপকরণ হলো আপনার সিভি। ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয় একটা সিভির পুরোটা রিক্রুটার পড়বেন কিনা, তার অনেকখানিই নির্ভর করে এই “ক্যারিয়ার অবজেকটিভ” অংশটার উপর। এবং এই অংশে যদি তিন চার লাইনে আগ্রহ তৈরি করানোর মত কিছু লিখে ফেলা যায়, তাহলে সম্ভাবনা থাকে পুরো সিভিটা পড়ার এবং পুরো সিভিটা যখন পড়বে তখনই সম্ভাবনা বেড়ে যায় শর্টলিস্টেড হবার/ইন্টারভিউতে কল পাবার। 

আমার প্রথম সিভির সামারিটা আবার হুবহু কপি পেস্ট করে নিজের সিভিতে ইউজ করবেন না দয়া করে। আমাদের সামনে গুগলের থেকে বড় শিক্ষক আপাতত কিছু নেই। গুগলে গিয়ে “how to write professional summary for fresh graduate” লিখে সার্চ দেন। প্রথম দশটা সাইটের লিংক ধরে পুরোটা পড়ুন, অনেক স্যাম্পলও দেয়া থাকে সেগুলো দেখুন, নিজের কন্সায়েন্স বাড়াবার ট্রাই করুন। তারপর নিজেরটা লেখার ট্রাই করুন।

জীবনের প্রথমেই সিভি তৈরির ক্ষেত্রে অন্যের সিভি থেকে কপি/পেস্ট করে নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনবেন না। অন্যেরটা দেখুন, তাতে আপত্তি নেই। তবে অন্যেরটা দেখে নিজের সম্পর্কে সুন্দর করে সৃজনশীল উপস্থাপনার চেষ্টা করুন। দেখবেন এতে একধরণের তৃপ্তি খুঁজে পাবেন। সেই সাথে বাড়বে আত্মবিশ্বাস। আর এই আত্মবিশ্বাসই আপনাকে আপনার স্বপ্নের জায়গায় পৌঁছে দিবে।

আজকের এই পর্বের লেখাটি ফ্রেশ গ্রাজুয়েটদের জন্য। কারণ অনেকেই জীবনের প্রথম পর্যায়ে এসে সিভি তৈরির ক্ষেত্রে কিছু কমন মিসটেক করে। ফলে আকাঙ্খিত জায়গা থেকে ডাক পাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তাড়াহুড়ো না করে, ধৈর্য্যসহকারে সিভি তৈরি করুন। পরবর্তীতে সিভির এডুকেশনাল সামারি কিভাবে লিখবেন, সেটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

লেখক : ডা. এস এম হাসানুল বারী, জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়ন গবেষক।   

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
About Author

Voicebd Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *