সাধারণত একজন কিশোরীর ৯ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে মাসিক শুরু হয়। পাহাড়ে অনেক সময়ই মেয়েদের মাসিকের এই গড় বয়সের চেয়ে বেশ আগেই মাসিক শুরু হয়ে যায়। যেহেতু পাহাড়ি মেয়েদের শারীরিক বৃদ্ধি ও গঠন অন্যান্যদের তুলনায় একটু ভিন্ন। আবার কিছু কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে দেখা যায় আয়রণ এর ঘাটতি কিংবা খনিজ উপাদানের ঘাটতির কারণে কিশোরী মেয়েদের বেশী বয়সে গিয়ে মাসিক অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে। এতে স্বাভাবিক শারীরিক গড়ন হয় রোগা বা খাটো। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যালনিউট্রিশন ক্লাসিফিকেশন মানদন্ডে বয়সের সাথে উচ্চতা এবং ওজন এর সাথে উচ্চতার অসামঞ্জস্য দেখা যায়, যাকে যথাক্রমে কৃশকায় ও খর্বকায় বলে। যা অপুষ্টির ফলে হয়ে থাকে। পরবর্তীতে ম্যালনিউট্রিশনের এই ঘাটতি পূরণ করা খুব কষ্টসাধ্য।


Height for Age = Stunning (কৃশকায়) অর্থাৎ বয়সের তুলনায় রোগা।
Weight for Height = Wasting (বেটে বা খাটো) অর্থাৎ ওজনের তুলনায় বেটে।
এবার আসি মাসিক হবার পর মেয়ে বা নারীরা কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বা স্বাভাবিক কাজের সাথে নিজেকে কতোটা মানিয়ে নিতে পারে? মাসিকের সময় মানসিক ও শারিরীক পরির্বতনের ফলে স্বাভবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটে। অনেকেই মাসিক নিয়ে কিছুটা আতঙ্কে থাকে, মাসিকের দিনগুলিতে মানসিক কষ্টে ভোগে, পাহাড়ের অনেক কিশোরী পর্যাপ্ত পানির সুব্যবস্থা না থাকায় অসহায়বোধ করে, নিজেকে অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন মনে করে, পরিবার, বন্ধুবান্ধবী ও পরিবেশের সাথে মিশতে ভয় পেয়ে দূরে দূরে থাকে। এ সময়ে তাদের কাজ করতে ইচ্ছে করেনা, শুয়ে থাকতে ভালো লাগে। অনেক সময় পিরিয়ডের ব্যাথা থাকে যা তাকে আরো কাবু করে ফেলে, ফলে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারে না।

মাসিকের সময়ে খাদ্যাভাসের বিরাট একটা পরিবর্তন আসে। টক খেতে ভাল লাগে, খাওয়ার রুচি থাকে না, ফলে পুষ্টির অভাব তৈরি হয়। যে পরিমাণ আয়রণ এর ঘাটতি শরীরে তৈরি হয়, তা খাবারের মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। আয়রণ ও আমিষের পরিপূরক খাবার যেমন : লাল শাক, কচুমুখি, কচুশাক, কাচা কাঁঠালের তরকারী, মাংসের কলিজা, মাংস, খেজুর, কিসমিস, কাঠ বাদাম, দুধ ও দুধের তৈরী খাবার, কাচাঁকলা, পাঁকা কলা, পাকা পেঁপে, ডিম। টক জাতীয় ফল যেমন- কমলা, লেবু, কাঁচা আম,আমলকি, জামরুল সহ দেশি ফল খেতে হবে। প্রচুর পরিমানে পানি পান করতে হবে কারণ কিশোরী মেয়েরা এমনিতে পানি পান করতে চায় না, ফলে প্রস্রাবের ইনফেকশন দেখা দেয়।


গ্রামের মেয়েরা এখনো পিরিয়ডের সময়ে পুরানো কাপড় ব্যাবহার করে থাকে, যা পরিষ্কার নিরাপদ পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়ে ব্যবহার করা না হলে ইনফেক্শন হওয়ার খুব সম্ভাবনা থেকে যায়। কাপড়ে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে যা ব্যবহারের ফলে যৌনিপথে বিভিন্ন সংক্রমণের সৃষ্টি হতে পারে। তাই আমাদের সচেতনতার সাথে সঠিক ব্যবহারবিধি ও স্বাস্থ্য সম্মত হতে আরো আন্তরিক ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন ।
আমি একজন উন্নয়নকর্মী এবং সরাসরি মাসিক স্বাস্থ্য ও যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার বিষয়ে বান্দরবান সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কিশোরী ও যুবতী নারীদের নিয়ে যেহেতু কাজ করছি। সেহেতু আমি মনে করি মাসিক স্বাস্থ্য ও যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য জানার ক্ষেত্রগুলোতে কিশোরীদের কে আরো বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের এই বিষয়গুলো আরো বেশি করে জানাতে হবে।

যাতে সমাজের বিভিন্ন ট্যাবু ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তারা তাদের অবস্থান থেকে আওয়াজ তুলতে পারে। আমরা বলি মাসিক আমার অধিকার, সুস্থ্য ও মাসিকের উপকরণ সহজলভ্য করতে হবে, তাই সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এই করোনা অতিমারির মধ্যেও মাসিকের বিষয়ে সচেনতার সাথে সাথে মাসিকের উপকরণ সহজলভ্য করা ও সেবা গ্রহণের সুযোগ বাড়াতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

লেখক : ম্যামিসিং মারমা, উন্নয়নকর্মী ও পুষ্টিবিদ, বান্দরবান।
(বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত)

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
About Author

Voicebd Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *