জন্ম-মৃত্যু। চিরায়ত এক সত্যকথন। কখনও তা মিথ্যে হবার নয়। সুযোগ নেই। জন্ম নিলে মরতে হয়। কে কখন মরবে? কে কখনই বা জন্ম নেবে? প্রশ্ন উঁকি দেয় মনের খিঁড়কি দিয়ে। কোনো না কোন সময়। অনুসন্ধিৎসু মনন-বীক্ষায় রেখাপাত করেই এই জিজ্ঞাস্য।
মানুষ কেন জন্ম নেয়? কেনইবা মরে? জন্মের আগে কোথায় ছিল মানুষ? মৃত্যুর পর কোথায় যাবে? বহতা জীবনে এই ভাবনা-বলয়ে কতোবার অনুরণন হয় মস্তিষ্ক? অহোরাত্রি। কেউ কি জানে? আমি জানি না। জানতে চেষ্টা করিনি কখনই।ইচ্ছে করে না। তবুও কখনও বা এইসব দূরবীক্ষায় এসে জীবনের বাঁক হারিয়ে ফেলি।কেন এমন হয়? অথচ অনিচ্ছের আগুনে পীঠ দিয়েও আমাকে জন্মাতে হয়েছে।
আমি কী হতে চেয়েছিলাম? মনে পড়ছে না। তবে আজন্ম চেয়েছি একজন স্রষ্টা হতে। ক্রিয়েটর হতে। ক্রিয়েটিভ ক্রিয়েটর। ছবি আঁকা, কবিতা ও গল্প লেখা, বাচিক উৎকর্ষতা সাধন, সুন্দর হাতের লেখাসহ আরও অনেক সৃজনীশক্তি আমি ছোটবেলায়ই অর্জন করেছিলাম।
মানুষের অবস্থান তার স্বভাবের বাইরে না। আমি যা হতে চেয়েছিলাম, তাই হয়েছি। তাই হতে চলেছি। আজন্ম একজন ভালো মানুষ হতে চেয়েছি।সাদাকে সাদা আর কোলোকে কালো বলা লোক।
লেখাপড়া করেছি বহুমাত্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। একাডেমিক শিক্ষায় সবসময়ই একটা বৈরাগ্য ছিল। গঁৎবাঁধা কোন শিক্ষাপদ্ধতি আমার পছন্দ নয়। নোটেড বুটেড স্যুটেড শিক্ষা জীবন আমার না। এর বাইরে দাঁড়িয়ে আমি যাপিত জীবনের অনেক পাঠ নিয়েছি। আর্টস বিভাগই পছন্দ। সাইন্স বা অন্যান্য বিভাগে আগ্রহ নেই। অতোটা বুঝি না। পড়াশুনা করি এখনও।
বই পড়ি। যে কোন ধরণের। যে কোন বিষয়ের। সাহিত্য ও সৃজনশীল বই বেশি পছন্দ। ছোটবেলা থেকেই। একাডেমি বই যখন পড়তাম, বাংলা প্রিয় বিষয় ছিল। সাহিত্য। গল্প কবিতা। সহজপাঠ্য ছিল। যখন একটু বুঝতে শিখি, প্রবন্ধ মননশীল লেখার দিকে ঝোঁক প্রবল হয়। একটু একটু বুঝতে শিখি যখন, তখন। এখন এটা আরও গভীরতা পেয়েছে।
লেখালেখি কবিতা দিয়েই। ছন্দ জানি না। কবিতা লিখি। ছন্দ জেনে কবিতা লেখা হয়? ভেতরে যাঁদের ছন্দ খেলা করে, সহজাত হাত আসে ছন্দে। আয়োজন করে শিখতে হয় না। ব্যাকরণ আগে না ভাষা আগে? আমরা জানি। ভাষার প্রয়োজনে ব্যাকরণ, ব্যাকরণের প্রয়োজনে ভাষা নয়। ভাষার পায়ে শৃঙ্খল পড়াতে ব্যাকরণ আসে।
রাত জেগে পড়ি। একটি বিষয়কে চারদিক থেকে আলো ফেলে প্রতিভাত করা আমার আজন্ম চরিতাভিধান। সিন্ধু সেঁচে মুক্তু আহরণ আমার অভিযাত্রিক প্রয়াস। চাকুরী করেছি বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানে। পত্রিকা সম্পাদনা, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ইনচার্জ, কারিগরি কলেজ কো-অর্ডিনেটর, প্রপোজড ইউনিভার্সিটি কো-অর্ডিনেটর, অ্যাডফার্ম, ফ্যাশন হাউজ, মিডিয়া হাউজ সহ অনেক ধারার প্রতিষ্ঠানেই কাজ করার ছোট-খাটো অভিজ্ঞতা রয়েছে এই নগণ্যের।
আমি কর্মী, আমি সৎ ; কর্মই আমার ধর্ম, সততাই আমার কাছে সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা; পথপ্রয়াসে, স্বপ্ন ও সম্ভাবনায়, সংগ্রামে সঙ্গোপনে আমি আদর্শকে সবার উপরে ঠাঁই দিই, জীবনবহতায় কখনই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনা, জীবনাচারে আমি বিনীত প্রাণিত দীপিত উদ্দীপিত আলোকিত সাম্য মৈত্রী সম্প্রীতির ধারক-বাহক হয়ে, মানুষের মানচিত্র রচনা আমার আজন্ম লালিত স্বপ্ন, মানুষের নি:স্বার্থ কল্যাণ ও মানবমুক্তির সোপান পেরিয়ে আমি শ্বাশ্বত সুন্দরের ডাক দিই দুয়ারে দুয়ারে, সেবার মানকে আমি মানুষের দোরগোঁড়ায় নিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর, মননে ভাবনায় লাল-সবুজ স্বপ্নকে বাস্তবায়নে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞায় অবিচল, __ ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়…’ এই স্বনির্ভরতা নিয়ে আমি ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশ বিনির্মাণে সতত সততায় ন্যায়পরায়ণতায় অঁটুট অনড় ___ বিশ্বাস করি, যার যা কাজ তা সঠিক ও সুচারুরূপে প্রতিপালন করাই দেশপ্রেম___ সেই আমাকে ‘কেউই দাবায়ে রাখতে পারবে না…’ সহজাত নির্লোভ নির্মোহ চিত্তে আমি যেকোন অবস্থানে থেকেই নিজের কাজটা শতভাগ আন্তরিকতা, সফলতা ও সম্ভাবনায় জ্বলে ওঠবোই।
কেউ যদি আমাকে বিখ্যাত কারও সাথে তুলনা করে, আমার খুব মন খারাপ হয়। চোখে বৃষ্টিকদম দেখি। বেহালায় মেঘমল্লার শুনি। মনে মনে ভাবি, আহা এখনো আমি আমার আমিকে নির্মাণ করতে পারিনি। এখনো আমি আত্মপরিচয়ে বলিয়ান হতে পারিনি। চিরকাল নিজের স্বতন্ত্রটাই চাইছি। আমার আমিকে খুঁজে ফিরছি এই পথপ্রয়াসে। জীবনের এই পান্থশালায়।
আমি নারীকে নিয়ে আলাদা কোন বিশেষ দিবস হোক, মানিনা। এইসব হচ্ছে নারীকে আলাদা করার আদিম কুসংস্কার। নারীকে মানুষ হওয়ার অন্তরায় এইসব দিবস। নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী করা হচ্ছে কৌশলে। যেসকল নারীনেত্রীগণ, এই দিবসের পক্ষে সোচ্চার, তাঁরা কি তাঁর কাছের-দূরের ঘরের- পরের পুরুষটিকে যথাযথ মূল্যায়ন করছেন? অথচ নারী পুরুষ উভয়ে মিলিয়ে যৌথভাবে পারস্পরিক মূল্যবোধ বজায় রেখে প্রকৃত ও প্রাকৃতজন হওয়ার সাধনা করে যাওয়াই বড় প্রয়োজন আজ। মানুষ হওয়ার অনুশীলনে সতত ব্যপৃত থাকাই আসল শোভন ও মৌলকর্ম। আমরা কি তা হতে পেরেছি? পুরুষেরা আদতেই আদিম ভণ্ড। চিরকাল নারীকে ভোগ্য পণ্য হিসেবেই রেখেছে। নারীকে দেয়নি কোন অধিকার। নবী হওয়ার অধিকার। প্রভূ হওয়ার অধিকার। মালিক হওয়ার অধিকার। আমাদের এই আদিম সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। মানুষ হয়ে উঠতে হবে। মনুষ্যত্বের চাষাবাদী হতে হবে। তুমি যে বিশ্বাসের চাষাবাদী হওনা কেন, এটা তোমার অধিকার। আমার সমর্থন নাও থাকতে পারে তোমার বিশ্বাসের প্রতি, কিন্তু তুমি স্বাধীনভাবে সেই বিশ্বাসের চাষাবাদী থাকো_ আমি তা মনপ্রাণে চাই। তাই, তুমিও আমার বিশ্বাসকে মর্যাদা দাও, আমি তা চাইতেই পারি। এটাও আমার অধিকার।
আমি একজন লেখক।শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতি কর্মী। সৃষ্টিশীল মননশীলতায় আছি। থাকতে পছন্দ করি। মুক্তচিন্তা ও সত্যভাষণ আমার শক্তি।অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতায় বিশ্বাসী। যা কিছু সত্য যা কিছু সুন্দর ও কল্যাণকর, আমি অনায়াসেই দ্ব্যর্থহীনতায় অকুতোভয়।ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের সৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ এদেশের সব ক্রান্তিলগ্নে যে সকল মহানায়কেরা জীবন উৎসর্গ করে গেছেন, আমি তাঁদের সুযোগ্য উত্তরসুরি হতে বদ্ধপরিকর।
বাংলাদেশ নামের যে দেশটি আমরা অনেক রক্ত ত্যাগ ও প্রাণের বিনিময়ে অর্জন করেছি, তা নানা পর্যায়ের আন্দোলনের সমন্বিত রূপ। সকলের মিলিত শক্তিতে অর্জিত এই মহাকাব্য। এদেশকে সব ক্রান্তিকাল অতিক্রমণযাত্রায় যে সকল মহানায়কেরা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন এবং এখনো দিয়ে যাচ্ছেন, সকলের প্রতি আমার লাল-সবুজ সালাম। বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। আন্তরিক অভিবাদন।
২৪ জুলাই, (শনিবার)। এইদিনে আমি পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম প্রথম। সেদিন থেকেই জেনেছি ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়। ‘সবার ভালোবাসা নিয়ে থাকতে চাই। শুভকামনা চাই সবার। যাঁরা আমার এই জীবনের সর্বমাত্রিক পথপ্রয়াসে পাশে ছিলেন, আজও আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন, কাউকে না দিয়ে বাদ সবাইকে ধন্যবাদ।
লেখক :  জীবন তাপস তন্ময়
সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মী। 
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
About Author

Voicebd Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *